কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ১১ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ০৪:৫৪ PM
কন্টেন্ট: পাতা
উপজেলা পর্যায়ে ২০২৫ সালে ৫টি ক্যাটাগরিতে বিজয়ী ৪ জন অদম্য নারী
অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অজনকারী নারী
মোসা: শরিফা খাতুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার উপর রাজারামপুর গ্রামের অতি দরিদ্র দিনমজুর মোহা: হজরত আলীর কন্যা। তার বাবা ইট ভাটায় কামলা খাটত ও বিকালে বাদাম বিক্রি করত। চাচারাও ছিল দিনমজুর, পরিবারে স্থায়ী আয়ের কোন উৎস ছিল না। তাই মাও সেলাই মেশিনের কাজের উপার্জন সংসারে লাগাত। বাবা মা তিনটি সন্তান জন্ম দিলেও অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় তার ২টি ভাই বোন মারা যায়। সে বাবা মার একমাত্র নয়নের মনি। তাকে নিয়ে বাবা মার অনেক স্বপ্ন থাকলেও ছিলনা সামর্থ্য। তাই ছোট বয়সেই মাত্র ক্লাস টেনে তার বিয়ে হয় দরিদ্র তবে উদার মনের একজন রাজমিস্ত্রির সাথে। পরিবারের সাপোর্টে সে সাত মাসের অন্ত:সত্তা অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষা দেন এবং ছোট সন্তান নিয়ে এইচএসসি পাশ করেন। অর্থের অভাবে বাইরে পড়তে যাওয়ার সাহস না পেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জেই মহিলা কলেজে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হয়ে নানান চড়ায় উৎরায়ের মধ্যে ২টি সন্তান নিয়ে ২০১৩ অনার্স ও ২০১৪ সালে রাজশাহী কলেজ হতে মাস্টার্স শেষ করেন। পড়ালেখা শেষে একটা চাকুরীর জন্য চেষ্টা করে, চাকুরী না পেলে সে নিজের হাতের কাজের পণ্য দিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেণ। তখন থেকে শুরু করেন তার উদ্যোক্তা জীবনের নতুন যাত্রা। প্রথমে সে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন রকমের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজের হাতেই ডিজাইন এঁকে কাঁথা, বিভিন্ন থ্রি-পিস, পাঞ্জাবী তৈরি করে বিভিন্ন স্কুলের অভিভাবকদের কাছে, স্থানীয় বিভিন্ন বুটিক হাউস গুলোতে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ শুরু করেন বর্তমানে সে দেশে ও দেশের বাইরেও বিভিন্ন মেলাতে অংশ গ্রহণ করে তার পণ্য অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমেই ক্রেতার কাছে সরবরাহ করে থাকেন। সাফল্যের মূল চাবিকাঠিই হলো প্রচেষ্টা। এভাবনা থেকেই সে ২০২০ সালে নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান “প্রচেষ্টা নকশী কাঁথা” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে। তার প্রতিষ্ঠান হতে ঐতিহ্যবাহী নকশীকাঁথা হাতের কাজের থ্রি-পিচ পাঞ্জাবী, সুস্বাদু আমসত্ত্ব, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হোমমেড চুলের তেল, সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রোডাক্ট পরিবেশ বান্ধব কাগজের কলম তৈরী হয়। প্রকৃতির সবুজায়নে তার কলম ছোট্ট হলেও ভূমিকা রাখে। কারণ এটি একদিকে যেমন কাগজের তৈরী তেমনি এর মধ্যে রয়েছে একটি গাছের বীজ। যা কলম ব্যবহার শেষে যখন সেটি ফেলে দেওয়া হয় তখন সে বীজ থেকে গজায় একটি বৃক্ষ চারা যা প্রকৃতির সবুজায়নে ভূমিকা রাখে। হার পাওয়ার প্রকল্প হতে ফ্রীল্যান্সার গ্রাফিক্স ডিজাইনার ক্যাটাগরিতে সিলেক্ট হয়ে একটি ল্যাপটপ উপহার পেয়ে বিভিন্ন ফিল্যান্সিং সাইটে সে তার কাজ সাবমিট করে থাকেন, এছাড়াও গ্রাফিক্স ডিজাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যেক্তাদের লোগো, ফেসবুক পোস্টার, ব্যানার, কভারফটো, ভিজিটিং কার্ড ও টি-শার্ট ডিজাইন করেদেন। এখন অনলাইনে তার অনেক বড় একটি মার্কেট প্লেস রয়েছে। যার মাধ্যমে দেশ ও দেশের বাইরে পন্য সরবরাহ করে থাকে। বর্তমানে সে উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসে অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের প্রশিক্ষক হিসাবে ৩০ জন নারীকে বিভিন্ন কাজ শিখিয়ে নিজের পায়ে দাড়াতে সহায়তা করছে। তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০০ জন নারী নিয়মিত কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে এবং মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতনভূক্ত ৮জন কর্মচারী রয়েছেন। যারা নিজের পরিবার চালানোর পথ খুজে পেয়েছেন। কেননা একটি নারী যখন সাবলম্বী হয় তখন সে শুধু নিজের জীবনই পরিবর্তস করে না বরং একটি পরিবার ও সমাজ উন্নয়ণে ভুমিকা রাখে। উদ্যেক্তা জীবনের শূরুতে অনেক কষ্ট, যেমন মুলধনের অভাব, বাজারজাত করণের সীমাবদব্ধতা তাকে থামাতে চেয়েছে। কিন্তু সে তার সততা, ধর্য্য ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে প্রতিকুলতাকে জয় করে নিজে যেমন প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারকে সাহায্য করছে, তেমনি আসহায় নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী
মোসা: নিসাতারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের ফিল্ডেরহাট গ্রামের হতদরিদ্র পিতা মোঃ ইয়াসির আলী ও মোসা বিজলী বেগমের ঘরে ৮ ডিসেম্বর, ১৯৯৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে সে চতুর্থ। প্রাইমারি বই কিনতে না হওয়ায় তা শেষ করতে পারলেও ২০০৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণীতে বই কিনতে পড়তে হবে বুঝলে বাবা পড়া বাদ দিতে বলেন। সে ফুফাতো ভাইয়ের বই নিয়ে পড়া চালাতে থাকে। তখন তার বাবা মুরগি বিক্রয় করত, তাকে বাবার সাথে মুরগির দোকানে থাকা লাগত। এজন্য তার প্রায় স্কুল যেতে দেরি হওয়ায় নানান রকম শাস্তি পেতে হতো, যা মুখ বুজে সহ্য করেছেন। সপ্তম শ্রেণীতে বাবা ব্যাকরণ বই কেনার জন্য শুধু ১৫০ টাকা দিয়েছিল, তার মা অন্যের বাড়ীতে ধান ভাঙ্গার কাজ করে বই কিনে দিত। মায়ের কষ্ট তার মানুষ হওয়ার মুল অনুপ্রেরণা। ২০০৮ সালে অষ্টম শ্রেণীতে উঠলে রোল ৫ হয়। বাবার দোকানে রাত ১০টা পর্যন্ত থাকার কারণে পড়াশোনার সময় না পাওয়ায় স্কুলেই ফাঁকা সময়ে পড়াশোনা করত। তিনি গণিত কম পারছিল। তখন সোহেল স্যারের সহায়তায় গণিতটা বুঝিয়ে নিয়ে নবম শ্রেণীতে চতুর্থ হয়। পারিবারিক অর্থভাবে বিজ্ঞান বাদ দিতে চাইলেও স্কুলের নিয়মে ও স্যারদের আগ্রহে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েছিলেন। অভাবের কারণে অন্যের ঘরে পড়াশুনা করে ২০১১ সালের এসএসসি পাস করেন। সোহেল স্যারের সহায়তায় সেই প্রতিষ্ঠানে একাদশে ভর্তি হয়। বইপত্র প্রতিষ্ঠান থেকেই দিয়েছিল আর ফরম ফিলাপের টাকা বাবা কিস্তি তুলে দিয়েছিল। এইচএসসি পাস করলে টাকার অভাবে ভর্তি ফরম পূরণ করতে না পারায় মায়ের জমানো ৩০০ টাকা দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজে গণিতে বিষয়ে চান্স পান। শত ঝামেলা আর যুদ্ধ করে অনার্স ভর্তি হলেও (১০+১০) ২০ টাকা যাতায়াত খরচ দিয়ে প্রতিদিন কলেজে আসতে হতো, ফলে দুমাস চালানোর পর আর না পারায় বন্ধ হয়ে যায় কলেজে আসা। তিন মাস বাসায় থেকে সেলাইয়ের কাজ করে আবার কলেজ যাওয়া শুরু করেন সে। কলেজের সেমিনার থেকে বই উঠিয়ে পড়তেন ও অন্যান্য খরচ সে নিজে চালাতেন। অন্যদিকে তার মা অন্যের বাসায় ধনের কুড়া চেলে ও অন্যের জমির ঘাস কেটে, ঘাস বিক্রি করে পড়ার খরচ যোগান দিয়েছে। ফিল্ডেরহাট থেকে সে পায়ে হেঁটে কলেজ করেছে যা প্রায় ৫কি.মি. পথ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গণিত বিষয়ে মাস্টার্স না থাকায় ২০১৮ সালে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হয় রাজশাহী কলেজে। তাই মূর্খের মেয়েকে লেখাপড়া পড়িয়ে ব্যারিস্টার -প্রফেসর বানাবে ইত্যাদি নানা কথা শুনতে হয় তার মাকে। ছাগল বিক্রির টাকা দিয়ে মাস্টার্স পড়াশোনা শুরু হয় এবং নানান চড়ায় উৎরায় এর মধ্য দিয়ে ২০২১ সালে মাস্টার্স পাস করে। রাজশাহী থেকে পড়েছে বলে তার চরিত্রে দাগ দিতেও কেউ কুণ্ঠাবোধ করেনি। রেজাল্টের পর চাচাতো বোনের মেয়েকে দেখাশোনা ও তার বাসায় থাকার ব্যবস্থা হলে সেখান থেকে চাকুরীর খোজা শুরু করেন। চাকুরির পড়া ও টিউশন সবই চলেছে তার একসাথে। অনেক কষ্টে কখনো টাকার অভাবে না খেয়ে সকালে বাসে ঢাকা গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে সাথে সাথে আবার ফিরে এসেছে। অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেই ২০২৪ সালে সহকারী শিক্ষক (গণিত) হিসেবে কুমিল্লায় লাকসাম উপজেলা জালাল মেমোরিয়াল হাইস্কুলে এনটিআরসিএ থেকে নিয়োগ পায়। বর্তমানে সেখানে চাকুরিরত আছেন এবং পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করতে পেরে অনেক খুশি ও আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান সে।
নির্যাতনের দু:স্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী
মোসাঃ খালেদা খাতুন, দুই ভাই-বোন। প্রবাসী বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে। অনার্স ২য় বর্ষে পড়া অবস্থায় এক সৈনিকের সাথে বিয়ে হয়। স্বামীর পরকিয়া ও লোভ লালসার কারনে খালেদার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়।। মিথ্যা অপবাদ ও চাকুরি করার কথা বললেই ডিভোর্সের হুমকি মুখে পড়তে হয়। অপমান ও গর্ভপাতের মতো নির্মম ঘটনার তাকে করা হয়েছে। অবশেষে ১১ বছর পর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে স্বামীর সংসার ছেড়ে এক মাত্র সন্তান (ছেলে) কে নিয়ে বাবার বাসায় চলে আসে। সমাজের ব্যক্তি বর্গের বিভিন্ন কথা ও মানসিক চাপসহ সব কিছু মিলিয়ে তিনি একদম শূন্য অবস্থায় ছিল। ছেলেকে কাঁধে নিয়ে অসহায়ত্ব কেটে ওঠার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্তমানে সে একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেছে।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী
মোসা: রহিমা খাতুন, বয়স ২৮ বছর নবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকে বাংলা বিভাগে মাস্টার্স শেষ করে। ২০১৪ সাল থেকে এনজিও সংস্থার কাজের মাধ্যমে মানুষের সেবা করার পরিচিত লাভ করে। ডাকসো এনজিও ৪টি প্রকল্পের মাধ্যমে পানির অপচয় রোধ ও বৃষ্টির পানি ব্যবহার সম্পর্কে জনগনের মধ্যে সচেতন করে। করনার সময় সাধারন মানুষকে সেবা দেওয়া জন্য তিনি ৩০০টি মাক্স ও হ্যান্ডসেনিটাইজার বিতরন করেন। এছাড়াও তিনি ডাসকোর এনজিওর সহযোগিতায় ১৫ টি অসহায় পরিবারে ৫০০০/- (পাঁচ হাজার টাকা) প্রদান করেন। সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে অসহায় গরীব ব্যক্তিদের প্রতিবন্ধী ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা বাবদ অর্থ সংগ্রহ করে দেন। বাল্যবিবাহ ও মাদক বিরোধে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। পরিশেষে আমি জনসেবামূলক কাজ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি।